মধ্যযুগে বাণিজ্যের পথে পালতোলা জাহাজে বিশ্ব ভ্রমণকারী সাম্পানের যুগে বাংলা ছিল ভারতীয় উপমহাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ( কেরালাও বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য ) । আজকের দিনে সুইজারল্যান্ড বা নরওয়েতে যাওয়ার জন্য মানুষ কতটা আগ্রহী, তখনকার সময়ে বাংলায় আসার জন্য বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষের মধ্যে একই উৎসাহ ছিল। ১৩০০ থেকে ১৭৫৭ সাল পর্যন্ত বাংলা ছিল বিশ্বের সবচেয়ে ধনী দেশগুলির অন্যতম।
বাংলার টেক্সটাইল শিল্প বিশ্বখ্যাত ছিল। ভেনিসিয়ানরা চীনা সিল্ক কিনতে বাংলায় আসত। আরবরা বাংলার টেক্সটাইল শিল্পের মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করত। তুর্কি, আরব, ইরানি এবং মিশরীয়রা বাংলার জাহাজ নির্মাণ শিল্প থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে নিজেদের জাহাজ তৈরি করত। বাংলার কৃষি উৎপাদন, বিশেষ করে চালের উপর পৃথিবীর অনেক রাজ্য নির্ভরশীল ছিল। বাংলার সুলতানরা মক্কা ও মদিনার মসজিদ ও মাদ্রাসাগুলিকে অর্থায়ন করতেন। গিয়াসউদ্দিন আযম শাহ ১৪০০ সালে মক্কা ও মদিনার জন্য দেড় কোটি টাকা (সেই সময়ের হিসাব অনুযায়ী) দান করেছিলেন। আজকের দিনের কোনো মুদ্রার সঙ্গে তুলনা করলে, কুয়েতি দিনার এই অর্থের পরিমাণের সবচেয়ে কাছাকাছি।
একসময় বাংলার ধান, মাছ, তেল, কাপড়, জাহাজ, কাঠ এবং মসলা এশিয়ায় প্রভাব বিস্তার করেছিল, যা আজকের প্রেক্ষাপটে বিশ্বাস করা কঠিন মনে হলেও সত্য। ইবনে বতুতার মত বিশ্ব ভ্রমণকারীরা ১৩৪৬ সালে বাংলার অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি দেখে বিস্মিত হয়েছিলেন। এমন সমৃদ্ধি আজকের মানুষের কাছে অবিশ্বাস্য মনে হলেও, বাংলার মানুষের জীবনযাত্রার মান তখন উচ্চমানের ছিল। তিন শতাব্দী আগে বাংলা সত্যিকার অর্থে একটি সমৃদ্ধ দেশ ছিল। ব্রিটিশ ও ক্যালকেটিয়ান উপনিবেশবাদের ফলে এই সমৃদ্ধির অবসান ঘটে। আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের কথা উচ্চারণ করে জনগণের মধ্যে একটি গর্ববোধ জাগিয়ে তুলেছে। তবে, বাংলাদেশের ইতিহাস ১৯৭১ সাল থেকে শুরু হয়নি; এর পূর্বেও বাংলার একটি সমৃদ্ধ অতীত ছিল। বাংলাদেশের মানুষ কখন এবং কীভাবে দারিদ্র্যের শিকার হয়েছিল, তা বুঝতে হলে ব্রিটিশ উপনিবেশবাদের প্রভাব বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
১৭৯৩ সালের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মাধ্যমে বাংলার জমিদাররা জমিদারি প্রথা স্থাপন করে এবং কৃষকদের উপর অত্যাচার চালাতে থাকে। ব্রিটিশরা এই ব্যবস্থাকে সমর্থন করে বাংলার সম্পদ লুণ্ঠন করে। ব্রিটিশরা বাংলাতে এসে প্রথমে কেড়ে নেয় আমাদের ব্যবসার অধিকার পরবর্তীতে ৫০ বছরের মধ্যে আমাদের দেশের সমস্ত সম্পদ দখল করে নেয়। ব্রিটিশ ঐতিহাসিক উইলিয়াম হান্টারের মতে, ১৮৫৭ সালের পূর্বে বাংলায় প্রায় ৮০,০০০ প্রাথমিক বিদ্যালয় ছিল। এছাড়াও, ওয়াকফ জমি নামে একটি ব্যবস্থা ছিল, যেখানে ধনীরা সামাজিক কল্যাণের জন্য জমি দান করতেন। ব্রিটিশরা এই সকল জমিগুলি দখল করে নেয়।
ব্রিটিশরা বাংলাদেশের মানুষের সম্পদ এবং জীবিকা কেড়ে নেওয়ার পর সর্বশেষ বেঁচে থাকা সম্মান পর্যন্ত ক্ষুণ্ণ করতে দ্বিধা বোধ করে না। বাংলাদেশের মানুষ ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে ফকির বিদ্রোহ, তরীকায়ে মুহাম্মাদীয়া, বালাকোট আন্দোলন এবং ফরায়েজী আন্দোলনসহ বিভিন্ন আন্দোলন করেছিল। ব্রিটিশরা বাংলাদেশের মানুষকে অবিশ্বাস করে সেনাবাহিনীতে নিত না, যার ফলে বাংলাদেশের মানুষকে ‘নন-মার্শাল রেস’ হিসেবে চিহ্নিত করা হত। সব থেকে দুঃখের বিষয় ব্রিটিশ শাসনামলে বাংলাদেশের মানুষের গড় উচ্চতা কুপোষণ এবং দুর্ভিক্ষের কারণে কমে গিয়েছিল। জানা যায় ব্রিটিশরা বাংলাদেশে আসার সময় তাদের গড় উচ্চতা ছিল ৫ ফুট ৫ ইঞ্চি, আমাদের প্রায় ইঞ্চিখানেক কম। পরের দেড়শো বছরে তাদের গড় উচ্চতা চলে যায় ৫ ফুট ৯ ইঞ্চির কাছাকাছি, আর আমরা বছর বছর দুর্ভিক্ষের কবলে পড়ে ৫ ফুট ৪ ইঞ্চির গড় উচ্চতায় নেমে গেলাম। জমি, খাদ্য, বস্ত্র, শিক্ষা এবং সামাজিক মর্যাদা হারিয়ে বাংলাদেশের মানুষদের চরম দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল। পর্তুগীজ, মোগল, মারাঠা এবং তৈমুরের আক্রমণ সত্ত্বেও বাংলা ধ্বংস হয়ে যায়নি। কিন্তু ব্রিটিশ শাসনের অধীনে বাংলায় মারাত্মক দুর্ভিক্ষ হয়েছিল। ১৭৭০ সালের দুর্ভিক্ষে বাংলার জনসংখ্যার প্রায় এক তৃতীয়াংশ মারা গিয়েছিল ক্লাইভের হরিলুটের খাই সামাল দিতে। ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষও বাংলার ১৫-২০ লাখ মানুষ মারা যায় কেবল না খেতে পেরে। এই দেশের অধিকাংশ মানুষের ছিল না কোন ব্যক্তিগত জমি। এমন কি পড়াশুনা করে যে কিছু সুফল পাবে তার উপায়ও ক্ষীণ কারণ এসএসসি পরীক্ষায় মুসলমান ছেলেরা সহজে পাস করতে পারতো না যতদিন না শেরে বাংলা খাতায় নাম উঠায় দিয়ে রেজিস্ট্রেশন নাম্বার, রোল চালু না করলেন। কেবল মাত্র জমিদার এবং ব্রিটিশদের চাটুকারি করেই কিছু খাওয়া-পরা সম্ভব ছিল। ফলে বাঙ্গালী হয়ে গেল চাটুকদার আর মিসকিনের জাত।